পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের পুলিশ এবং রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্সকে (আরপিএফ) এক নজিরবিহীন ও কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, রাজ্যটিতে আটক হওয়া কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের’ আর আদালতের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হবে না। এর পরিবর্তে তাদের সরাসরি বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করা হবে, যাতে দ্রুত তাদের পুশব্যাক বা ডিপোর্ট (বহিষ্কার) করা যায়।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত বৃহস্পতিবার হাওড়ায় সাংবাদিকদের জানান, ২০ মে থেকে এই নতুন নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, যেসব অবৈধ অভিবাসী ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) আওতায় নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য নন, তাদের হাওড়া বা অন্য কোথাও আটক করা হলে আদালতে না পাঠিয়ে সরাসরি উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর পেট্রাপোল সীমান্তে অথবা বসিরহাট বিএসএফ আউটপোস্টে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে তাদের যথাযথভাবে খাওয়ানোর পর বিএসএফের হাতে তুলে দেয়া হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি সাপ্তাহিক প্রতিবেদন রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালকের (ডিজিপি) মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী দপ্তরে (সিএমও) পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

এই পদক্ষেপটিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আলোচিত ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (শনাক্ত করো, বাদ দাও এবং বহিষ্কার করো) নীতিরই একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৬ সালে তৎকালীন ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু সংসদে জানিয়েছিলেন, ভারতে প্রায় দুই কোটি অবৈধ বাংলাদেশি বসবাস করছে, যাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে দিল্লি। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে হঠিয়ে বিজেপির ক্ষমতায় আসার পেছনে এই অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং সীমান্ত সুরক্ষার বিষয়টিই ছিল মূল নির্বাচনী ইস্যু।
পশ্চিমবঙ্গের এই হার্ডলাইন বা কঠোর নীতি প্রতিবেশী রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার অনুসৃত কৌশলের মতোই। আসামে ইতিমধ্যেই ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অপেক্ষা না করে শত শত কথিত বিদেশিকে পুশব্যাক করা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেন্দু অধিকারীর সাথে একটি ছবি শেয়ার করে ক্যাপশনে লিখেছিলেন, কারও কারও জন্য খারাপ দিন আসছে। ইঙ্গিতটি যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কথিত অনুপ্রবেশকারীদের দিকেই ছিল, তা স্পষ্ট।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে শুভেন্দু অধিকারী নির্দিষ্ট কোনো ধারার কথা উল্লেখ না করলেও, ধারণা করা হচ্ছে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারতের সংসদে পাস হওয়া ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫’-এর ওপর ভিত্তি করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শুভেন্দু জানান, গত বছরের ১৪ মে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলোকে অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল, যা এখন অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করছে তাঁর সরকার।

তবে আদালতের নজরদারি ছাড়া পুলিশ নিজে থেকে কাউকে অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করে বিএসএফের হাতে তুলে দিতে পারে কি না, তা নিয়ে স্বয়ং পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যেই তীব্র বিতর্ক ও সংশয় তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সাধারণত কোনো বিদেশি অবৈধভাবে প্রবেশ করলে বা মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করলে ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪(এ) ধারা অনুযায়ী মামলা করে আদালতে তোলা হয়। ওই ব্যক্তি সত্যিই অপরাধী কি না, তা নির্ধারণ করার এখতিয়ার একমাত্র আদালতের, পুলিশের নয়। আদালতের আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ বলেই মূলত শুভেন্দু সরকার এই বিকল্প ও বিতর্কিত পথ বেছে নিয়েছে।
ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কয়েক মাসেই শুভেন্দু অধিকারীর সরকার একের পর এক কড়া সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এর মধ্যে বিএসএফকে সীমান্ত কাঁটাতারের বেড়ার জন্য জমি দেওয়া, রাজ্যজুড়ে উচ্ছেদ অভিযান, ঈদুল আজহার আগে কোরবানির কঠোর নিয়ম কার্যকর করা এবং মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গান বাধ্যতামূলক করার মতো বিষয়গুলো রয়েছে। উদ্ভূত আইনি জটিলতা শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়াবে কি না তা সময়ই বলবে, তবে আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি তাড়াতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে পুরোপুরি বদ্ধপরিকর, তা এখন স্পষ্ট।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

