মার্কিন গোয়েন্দাদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ! ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা এত দিন যে বড় বড় জয়গান গেয়ে আসছিলেন, তা এক ঝটকায় ধূলিসাৎ হয়ে গেল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নতুন এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের যৌথ বোমা হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা যতটা ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল, তার চেয়ে বহুগুণ দ্রুত গতিতে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তেহরান। যুদ্ধবিরতির মাত্র কয়েক সপ্তাহ পার হতে না হতেই ইরান তাদের ড্রোন উৎপাদন নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ আবার চালু করে ফেলেছে।
মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক বিশেষ প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, গোয়েন্দা মহলের সব হিসাব-নিকাশ এবং ডেডলাইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইরানিরা অভাবনীয় গতিতে তাদের সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন করছে। যেখানে যুদ্ধ শেষে প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, মার্কিন-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ক্ষতবিক্ষত ইরানের প্রতিরক্ষা খাত জোড়াতালি দিতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাবে, সেখানে নতুন গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, আগামী মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ইরান তাদের ড্রোন হামলার পুরো সক্ষমতা আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে!

গোয়েন্দাদের এই গোপন তথ্য এমন এক সময়ে ফাঁস হলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হালের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও পুরোদমে যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দিয়ে রেখেছেন। সিএনএন-এর তথ্যমতে, ইরানের হাজার হাজার ড্রোন এখনো অক্ষত রয়েছে এবং তাদের মোট ড্রোন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই এই ভয়াবহ যুদ্ধ থেকে টিকে গেছে। এর চেয়েও বড় ভয়ের কারণ হলো, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ মিসাইলগুলো এখনো পুরোপুরি সচল। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর জোরেই তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’র সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল রুখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
নতুন এই গোয়েন্দা তথ্য খোদ মার্কিন সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্ববর্তী বড়াই করা দাবির মুখে বড়সড় চড় মেরেছে। চলতি সপ্তাহেই মার্কিন কংগ্রেসে কুপার বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন, অপারেশন এপিক ফিউরির মাধ্যমে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা শিল্প ঘাঁটির ৯০ শতাংশই গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যা কয়েক বছর তারা মেরামত করতে পারবে না।

কিন্তু সিএনএন’র রিপোর্ট বলছে, আমেরিকার এই ‘এপিক ফিউরি’ আসলে ইরানের সামরিক উৎপাদনকে কয়েক বছরের জন্য নয়, বড়জোর কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে দিতে পেরেছে মাত্র! মার্কিন হামলায় বহু গোপন সামরিক কারখানা হয় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, না হয় পুরোপুরি ধ্বংস করা যায়নি। আগে ধারণা করা হয়েছিল ইরানের অর্ধেক মিসাইল লাঞ্চার টিকে আছে, কিন্তু বর্তমান খতিয়ান বলছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ লাঞ্চারই বহাল তবিয়তে রয়েছে।
কিন্তু এত দ্রুত ইরান এই ‘ম্যাজিক’ দেখাল কীভাবে? মার্কিন গোয়েন্দাদের প্রবল সন্দেহ, এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও পর্দার আড়াল থেকে তেহরানকে জ্বালানি জুগিয়েছে তাদের দুই পরাশক্তি মিত্র, রাশিয়া ও চীন। সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ উঠেছে, যুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়েই চীন ইরানকে মিসাইল তৈরির প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে গেছে। যদিও মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রাখায় বর্তমানে এই সরবরাহ কিছুটা ধীর হয়ে এসেছে।

সম্প্রতি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি চীনের বিরুদ্ধে ইরানকে মিসাইল তৈরির পার্টস দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। তবে চীন এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘তথ্যপ্রমাণহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। আপাতত পেন্টাগন বাইরে ‘সব নিয়ন্ত্রণে আছে’ বলে আত্মবিশ্বাস দেখানোর চেষ্টা করলেও, ভেতরে ভেতরে মার্কিন প্রশাসনের রাতের ঘুম যে হারাম হয়ে গেছে, তা এই গোয়েন্দা রিপোর্টেই স্পষ্ট!

