যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ডিয়েগোর একটি ইসলামিক সেন্টারে দুই কিশোর বন্দুকধারীর গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। হামলায় মসজিদের বাইরে থাকা একজন নিরাপত্তা কর্মীসহ তিন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। পরে হামলাকারী ওই দুই কিশোর নিজেদের গুলি করে আত্মহত্যা করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। খবর রয়টার্সের।
স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। কর্মকর্তার জানিয়েছেন, ওই সময় মসজিদ চত্বরের একটি ডে কেয়ার স্কুলে অনেক শিশু উপস্থিত থাকলেও তারা সবাই নিরাপদ রয়েছে।
স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই সান ডিয়েগো কাউন্টির বৃহত্তম এই মসজিদে হামলার ঘটনাটিকে একটি ‘বিদ্বেষমূলক অপরাধ’হিসেবে তদন্ত করছে। তবে কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এই সহিংসতার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে জানায়নি।
এদিকে সান ডিয়েগো পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াল সন্ধ্যায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, গুলি চালানোর প্রায় দুই ঘণ্টা আগে দুই সন্দেহভাজনের মধ্যে একজনের মা পুলিশকে ফোন করেছিলেন। ওই নারী জানান, তার ছেলে মানসিকভাবে আত্মহত্যাপ্রবণ এবং সে তিনটি বন্দুক ও একটি গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে।
পুলিশ প্রধানের তথ্য অনুযায়ী, ওই মা পুলিশকে জানিয়েছিলেন তার ছেলে একা নয়, সঙ্গে একজন সঙ্গী রয়েছে এবং তারা দুজনেই ছদ্মবেশ ধারণ করে আছে। এই তথ্যের পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কিশোরদের খোঁজাখুঁজি শুরু করে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাছাকাছি একটি শপিং মল ও ছেলেটির হাই স্কুলে যখন টহল দল পাঠানো হচ্ছিলো, ঠিক তখনই মসজিদে গুলি চুরির খবর আসে।
পলাতক ছেলেটির মা একটি চিরকুটও খুঁজে পেয়েছিলেন। তবে পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াল তদন্তের স্বার্থে সেই চিরকুটের বিষয়বস্তু প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান। ওয়াল আরও বলেন, ঘটনার আগে মসজিদ বা অন্য কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়, স্কুল কিংবা শপিং মলে কোনো নির্দিষ্ট হুমকির তথ্য পুলিশের কাছে ছিলো না।
তবে পুলিশ সম্প্রতি ‘ব্যাপক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ঘৃণাবাজি’-র একটি ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলো। ছদ্মবেশে একাধিক অস্ত্রসহ পলাতক কিশোরের খবরের সঙ্গে এই বিষয়টি মিলে যাওয়ায় পুলিশ একটি বড়ো ধরনের হুমকির মূল্যায়ন শুরু করেছিলো।
মুসলিমদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা এবং সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় বার্ষিক হজ তীর্থযাত্রার মাত্র এক সপ্তাহ আগে এই নৃশংস হামলাটি ঘটল।
ঘটনার পর ইসলামিক সেন্টারের ইমাম ও পরিচালক তাহা হাসানে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা এর আগে কখনও এমন মর্মান্তিক ঘটনার সম্মুখীন হইনি। একটি উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত জঘন্য একটি কাজ।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা মসজিদের সঙ্গে যুক্ত গুলিবিদ্ধ তিন ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেন। কর্মকর্তারা নিহত নিরাপত্তা রক্ষীর সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, তার প্রতিরোধের কারণেই হয়তো আরও বড়ো ধরনের রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পরই, ঘটনাস্থলের অদূরে রাস্তার মাঝখানে একটি গাড়ির ভেতর থেকে ১৭ ও ১৮ বছর বয়সী দুই কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে বড়ো কিশোরটির বয়স ১৯ বছর বলা হলেও পরে সংশোধন করা হয়। দৃশ্যত, তারা নিজেরাই নিজেদের গুলি করে আত্মহত্যা করেছে। এই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো গুলি চালানো হয়নি।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সান ডিয়েগো এলাকা জুড়ে ৫০ থেকে ১০০ জন পুলিশ কর্মকর্তা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। খবর পাওয়ার মাত্র চার মিনিটের মধ্যে তারা ক্যালিফোর্নিয়ার দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল এই শহরের আবাসিক-বাণিজ্যিক এলাকা ক্লেয়ারমন্টে অবস্থিত মসজিদটিতে এসে জড়ো হন।
স্থানীয় টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গেছে, একটি হাইওয়ে ব্রিজের ওপর কয়েক ডজন পুলিশের টহল গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদের গম্বুজের কাছাকাছি ছাদে রাইফেল হাতে অবস্থান নিয়েছেন বিশেষ সরঞ্জাম পরিহিত পুলিশ সদস্যরা।
পুলিশ প্রধান জানান, এই হামলার কাছাকাছি সময়ে কয়েক ব্লক দূরে একজন বাগান ও আঙিনা পরিচর্যাকারীর ওপরও গুলি চালানো হয়। তদন্তকারীরা মনে করছেন ঘটনা দুটি পরস্পর সম্পর্কিত। তবে ওই ব্যক্তি অক্ষত আছেন। মাথায় হেলমেট থাকায় সেটি হয়তো বুলেট প্রতিহত করতে সাহায্য করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জনবহুল স্থানে বন্দুক হামলা নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠলেও সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মুসলিম ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানের ওপর বিমান হামলা চালানোর পর এবং ইরান পাল্টা বিমান হামলা চালানোর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার পর থেকে এই উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এর আগে গত মার্চ মাসে, ৪১ বছর বয়সী লেবাননি বংশোদ্ভূত এক মার্কিন নাগরিক মিশিগানের বৃহত্তম ইহুদি উপাসনালয়ে (সিনাগগ) তার ট্রাক দিয়ে ধাক্কা মারার পর নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর গুলিবর্ষণ করেন এবং আতশবাজি দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মহত্যা করেন। সান ডিয়েগোর এই মসজিদের মতোই ডেট্রয়েটের সেই সিনাগগটিতেও একটি দিবা বিদ্যালয় ছিলো।


