ট্রাম্পের প্রত্যাখানে আবারও অনিশ্চয়তায় মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রস্তাব

ট্রাম্পের প্রত্যাখানে আবারও অনিশ্চয়তায় মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রস্তাব

যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শান্তি প্রস্তাবের জবাবে ইরানের পাঠানো পাল্টা প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের পর ১০ সপ্তাহ ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার প্রভাবে সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় চার শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।

রোববার, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরান তাদের দীর্ঘ দাবিনামা পেশ করে। তেহরানের প্রস্তাবে শুধু ইউক্রেন বা আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং লেবাননে ইসরাইল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের অবসানকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া ইরান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের বিষয়টি পুনঃব্যক্ত করেছে। তাদের অন্যান্য দাবির মধ্যে ছিলো, মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা অর্থ ফেরত এবং তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

তবে প্রস্তাবটি পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে লেখেন, আমি এটি পছন্দ করছি না, এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। ট্রাম্পের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু কড়া প্রতিক্রিয়া আলোচনার টেবিলে বরফ গলার সম্ভাবনাকে আপাতত নাকচ করে দিয়েছে।


মার্কিন প্রত্যাখ্যানের পর সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তাদের প্রস্তাবকে ‘উদার এবং দায়িত্বশীল’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।

এদিকে, হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি প্রবাহের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যেত। বর্তমানে কিছু ট্যাঙ্কার ট্র্যাকার বন্ধ করে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।

ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যানের পর তেলের দাম চার শতাংশ বাড়ায় মার্কিন ভোটারদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনের আগে তেলের দাম বাড়ায় ট্রাম্পের রিপাবলিক দলের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।


চীন সফর ও কূটনৈতিক সমীকরণ: 
বুধবার চীন সফরে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকে ইরান ইস্যুটি বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প চাইছেন চীন তাদের প্রভাব খাটিয়ে ইরানকে একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য করুক। অন্যদিকে, ইরান আশা করছে চীন যেন ওয়াশিংটনের ‘একতরফা নীতি’র বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

সংঘাতের পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প এক মন্তব্যে বলেছেন, তারা (ইরান) পরাজিত হয়েছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা শেষ হয়ে গেছে। একই সুরে সুর মিলিয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত এবং তাদের প্রক্সি বাহিনীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ না করা পর্যন্ত কাজ বাকি আছে। তিনি প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের ইঙ্গিতও দিয়েছেন।

অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান কখনোই শত্রুর কাছে মাথা নত করবে না এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর।


শান্তি আলোচনার গুঞ্জন শোনা গেলেও বাস্তবে মাঠের চিত্র ভিন্ন। গত রবিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত দুটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং কাতারের জলসীমায় একটি কার্গো জাহাজ ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। কুয়েতও তাদের আকাশসীমায় শত্রুভাবাপন্ন ড্রোনের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে।

লেবাননেও ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের এই ‘না’ সংঘাতের আগুনকে নেভানোর পরিবর্তে আরও উসকে দিচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

administrator

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *