26.5 C
Bangladesh
May 16, 2026
Post Bangla

মার্কিন নৌ-অবরোধের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে প্রস্তুত ইরান

মার্কিন সামরিক বাহিনী সোমবার থেকে ইরানের বন্দরগুলো থেকে ছেড়ে আসা জাহাজগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে তেহরানও পালটা হুমকি দিয়ে জানিয়েছে, তারা পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর বন্দরে হামলা চালাবে। সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই ব্যর্থ হবার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা চলমান যুদ্ধবিরতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

সোমবার পুনরায় বাজার খোলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ এই সরবরাহ সংকট নিরসনে হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে দেয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত সব দেশের জাহাজের জন্য এই প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে।

তেহরানের দাবি, জাহাজগুলো শুধু ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে এবং নির্দিষ্ট ‘টোল’ প্রদানের মাধ্যমেই যাতায়াত করতে পারবে। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি এখন থেকে ইরানের নিজস্ব জাহাজ এবং যেসব জাহাজ ইরানকে টোল প্রদান করেছে, তাদের সবার পথ রোধ করবেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ছয় সপ্তাহের বোমাবর্ষণ যে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে স্থগিত হয়েছিল, তার মেয়াদ আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এই যুদ্ধবিরতি এখন হুমকির মুখে। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা।


মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সময় সকাল ১০টা (বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ৮টা) থেকে এই অবরোধ কার্যকর হবে। তারা স্পষ্ট করেছে, ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশকারী বা সেখান থেকে ছেড়ে আসা সকল দেশের জাহাজের ওপর কোনো বৈষম্য ছাড়াই এই অবরোধ আরোপ করা হবে। এলএসইজি-এর তথ্যমতে, মার্কিন অবরোধ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে তেল ও ডিজেল ভর্তি দুটি ইরানি ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে।

ইরানের সামরিক মুখপাত্র রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন এই বিধিনিষেধ হবে অবৈধ এবং এটি ‘জলদস্যুতা’র শামিল। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যদি ইরানের বন্দরগুলো হুমকির মুখে পড়ে, তবে পারস্য বা ওমান উপসাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না। এর আগে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস জানিয়েছিল, কোনো সামরিক জাহাজ হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি এলে তাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে।

রোববার ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে বলেন, যারা অবৈধ টোল দেবে, তারা আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিরাপদ যাতায়াত পাবে না। তিনি আরও যোগ করেন, যদি কোনো ইরানি আমাদের ওপর বা কোনো শান্তিপূর্ণ জাহাজের ওপর গুলি চালায়, তবে তাদের সরাসরি নরকে পাঠানো হবে!

সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ডানা স্ট্রোল বলেন, ট্রাম্প একটি দ্রুত সমাধান চাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই মিশন একা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন এবং মধ্যম থেকে দীর্ঘমেয়াদে এটি বজায় রাখা সম্ভব নাও হতে পারে।


তেহরানের প্রতিক্রিয়া: ‘কেউ কোনো শিক্ষা নেয়নি’

দেশে যুদ্ধের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়া এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে ট্রাম্প গত সপ্তাহে বোমাবর্ষণ স্থগিত করেছিলেন। তখন তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী খুলে না দেয়, তবে তিনি তাদের পুরো সভ্যতা ধ্বংস করবেন। ইরান এই দাবিকে তোয়াক্কাই করেনি, বরং আলোচনায় তাদের নিজস্ব কিছু নতুন দাবি তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজেরর ওপর ইরানি নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়া, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বিশাল মার্কিন ঘাঁটিগুলো থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়া।

ট্রাম্প যুদ্ধের শুরুতেই যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিলেন, যেমন ইরানের পারমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা এবং দেশটির সরকার পতনে জনগণকে উৎসাহিত করা, সেগুলো অর্জন করতে না পারলেও তিনি নিজেকে জয়ী দাবি করেছেন। তবে ইরান এখনও শত্রুর উপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বজায় রেখেছে।

জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থার গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ৪০০ কেজির বেশি বোমা তৈরির কাছাকাছি স্তরের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। বছরের শুরুতে গণবিক্ষোভের মুখে পড়লেও ইরানের নেতৃত্ব মার্কিন আক্রমণ সামলে নিয়েছে এবং দেশটিতে সংগঠিত কোনো বিরোধী শক্তির চিহ্ন বর্তমানে নেই।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম মজুদ ত্যাগ করা বা পরমাণু সমৃদ্ধকরণ বন্ধের দাবি নাকচ করে দিয়েছে। ওয়াশিংটন এখনো আশা করছে যে, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট থেকে বাঁচতে ইরান শান্তির পথে আসবে।

তবে আত্মবিশ্বাসী ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র আরও ছাড় দিলেই শুধু তারা চুক্তিতে পৌঁছাবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কেবল আধিপত্যবাদী আচরণ এবং অবরোধই পাওয়া গেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কেউ কোনো শিক্ষা নেয়নি। সদিচ্ছার বদলে সদিচ্ছা মেলে, আর শত্রুতার বদলে শত্রুতা।


তেল বাজারে অস্থিরতা

যুদ্ধবিরতির খবরে গত সপ্তাহে তেলের দাম কিছুটা কমলেও সোমবার তা পুনরায় ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেঞ্চমার্ক তেলের দাম আসলে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলছে না। বর্তমানে তেলের সরবরাহ এতটাই সীমিত যে, কিছু রিফাইনারি তেলের জন্য নির্ধারিত দামের চেয়ে রেকর্ড ৫০ ডলার পর্যন্ত বেশি প্রিমিয়াম দিতে বাধ্য হচ্ছে।

জেপি মরগানের বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া এখন বাজারের জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ যুদ্ধ শুরুর আগে রওনা দেয়া সর্বশেষ তেলের ট্যাঙ্কারটি ২০ এপ্রিল গন্তব্যে পৌঁছাবে। এর অর্থ হলো, এপ্রিলের ২০ তারিখের পর বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ চেইন থেকে পারস্য উপসাগরীয় তেল পুরোপুরি ফুরিয়ে যাবে।

ট্রাম্প তেলের দাম বৃদ্ধিকে সাময়িক বললেও সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত এই চড়া দাম বজায় থাকতে পারে। ইরানের প্রধান আলোচক ও দেশটির স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ আমেরিকার জ্বালানি তেলের বর্তমান উচ্চমূল্যের একটি মানচিত্র পোস্ট করে ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, বর্তমান দাম উপভোগ করুন। আপনাদের তথাকথিত এই ‘নৌ-অবরোধ’ চলতে থাকলে আপনারা শিগগিরই ৪-৫ ডলারের পেট্রোলের জন্য হাহাকার করবেন।

সূত্র: রয়টার্স

Related posts

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে টোল আদায় শুরু করলো ইরান

bangladmin

ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না: ট্রাম্প

bangladmin

আপিলেও বাতিল মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র

bangladmin

হাসপাতালে ভর্তি আশা ভোসলে, অবস্থা সংকটাপন্ন

bangladmin

আল্লু অর্জুনের জন্মদিনে বাসভবনে ভিড়, পুলিশের লাঠিচার্জ

bangladmin

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা নেই: ইরান

bangladmin